1. mail@tathagataonline.net : admi2017 : নিজস্ব প্রতিবেদক
সোমবার, ০২ অগাস্ট ২০২১, ০৭:৪১ পূর্বাহ্ন

এশিয়াতে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার ও প্রসার

ডাঃ আলেক্সান্ডার বরজিন
  • আপডেট বৃহস্পতিবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২০
মিশনারি (ধর্ম-প্রচারক) আন্দোলনের বিকাশ কখনও না হওয়া সত্ত্বেও বুদ্ধের শিক্ষাগুলি বহু শতাব্দী ধরে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রথমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে, তারপর মধ্য-এশিয়ার মধ্য দিয়ে চীন ও বাকী পূর্ব এশিয়া, এবং অবশেষে তিব্বত ও মধ্য-এশিয়ার দূরতম স্থানগুলিতে ছড়িয়ে পড়েছিল। অধিকাংশ বিদেশী বণিকদের মধ্যে বৌদ্ধ ধর্মের উপর আস্থা ছিল এবং সেই আস্থার প্রতি স্থানীয় মানুষদের আগ্রহের কারণে এই অঞ্চলগুলিতে বৌদ্ধধর্ম সংগঠিতভাবে বিকশিত হয়েছিল। কখন-কখন শাসকেরা তাদের প্রজাদের মধ্যে নৈতিকতা বিকাশ করার জন্য বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু কাউকে ধর্ম পরিবর্তন করার জন্য বাধ্য করা হয়নি। বুদ্ধের বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছনোর পর তাদের স্বাধীনতা ছিল যে, যেটা তাদের জন্য উপযোগী সেটা তারা পছন্দ মতো করতে পারত।

 

বুদ্ধের শিক্ষাগুলি সম্পূর্ণ ভারত উপমহাদেশে এবং সেখান থেকে এশিয়ার বহু দূর-দূরান্তে শান্তিপূর্ণভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। যখনই এটি একটি নতুন সংস্কৃতিতে পৌঁছেছিল, বৌদ্ধ পদ্ধতি এবং শৈলীগুলি চেতনা এবং করুণার প্রয়োজনীয় বিষয়গুলির সাথে আপোশ না করে স্থানীয় মানসিকতার সাথে খাপ খাওয়ার জন্য স্বাধীনভাবে ধরণ নির্ণয় করেছিল। বৌদ্ধ ধর্ম কখনও সর্বোচ্চ প্রমুখের অধীনে ধর্মীয় কর্তৃত্বের সামগ্রিক যাজকতন্ত্র গড়েনি। এর পরিবর্তে যেখানে এটি ছড়িয়েছে, প্রতিটি দেশ এর নিজস্ব স্বরূপ, নিজস্ব ধর্মীয় কাঠামো এবং নিজস্ব আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব বিকাশ করেছে। বর্তমানে এই কর্তৃপক্ষগুলির মধ্যে সর্বাধিক সু-পরিচিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত হলেন তিব্বতের পরম পূজ্য দালাই লামা।

সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

বৌদ্ধধর্মের দুটি প্রধান শাখা আছেঃ শ্রাবক যান (সাধারণ যান), যে যানটি ব্যক্তিগত মুক্তির উপর জোর দেয় এবং মহাযান (বৃহৎ যান), যা পরকল্যাণ করতে সক্ষম হওয়ার জন্য পূর্ণ জ্ঞানদীপ্ত বুদ্ধ হওয়ার উপর জোর দেয়। সাধারণ এবং বৃহৎ, উভয় শাখারই অনেকগুলি উপশাখা আছে। বর্তমানে, কেবল তিনটি প্রধান রূপই টিকে আছেঃ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রবর্তিত শ্রাবকযানের একটি উপশাখা, যা থেরবাদ হিসাবে পরিচিত, এবং মহাযানের দুটি শাখা, চীনা এবং তিব্বতী পরম্পরা বা উপশাখা।

  • থেরবাদ মতবাদ খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে ভারত থেকে শ্রীলঙ্কা এবং বার্মা (মায়ানমার) পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। সেখান থেকে এটি দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়ার বাকি অংশে ছড়িয়ে পড়েছিল (থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া এবং লাওস)।
  • অন্যান্য শ্রাবকযান স্কুল আধুনিক পাকিস্তান, আফগানিস্তান, পূর্ব এবং উপকূলীয় ইরান আর মধ্য এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল। মধ্য-এশিয়া থেকে এগুলি দ্বিতীয় শতাব্দীতে চীন দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। শ্রাবকযানের এই রূপগুলি পরে ভারত থেকে একই পথে আসা মহাযান শাখাগুলির সাথে যুক্ত হয়, যেটা শেষ পর্যন্ত, চীন এবং মধ্য-এশিয়ায় মহাযান বৌদ্ধধর্মের প্রভাবশালী রূপে পরিণত হয়। চীনের মহাযান রূপটি পরে কোরিয়া, জাপান এবং ভিয়েতনামেও ছড়িয়ে পড়েছিল।
  • ভারতীয় বৌদ্ধধর্মের সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক বিকাশের উত্তরাধিকার সূত্রে তিব্বতী মহাযান পরম্পরাটি খ্রীষ্টিয় সপ্তম শতাব্দীতে শুরু হয়েছিল। তিব্বত থেকে এটি হিমালয় অঞ্চলে ও সেখান থেকে মঙ্গোলিয়া, মধ্য-এশিয়া এবং রাশিয়ার বেশ কয়েকটি অঞ্চল (বুরিয়াতিয়া, কাল্মেকিয়া এবং টুভা) জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল।

এছাড়াও দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে মহাযান বৌদ্ধধর্মের ভারতীয় রূপগুলি ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া, সুমাত্রা এবং জাভায় সমুদ্র বাণিজ্য পথে ভারত থেকে দক্ষিণ চীন পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। এগুলির কোনোটাই আজ বিদ্যমান নেই।

বৌদ্ধধর্ম কীভাবে প্রচার  প্রসার হয়েছে

বেশিরভাগ এশিয়া জুড়ে বৌদ্ধধর্মের বিস্তৃতি শান্তিপূর্ণ ছিল এবং বিভিন্নভাবে ঘটেছিল। শাক্যমুনি বুদ্ধ, একজন পরিব্রাজক (ভ্রাম্যমান) শিক্ষক হিসাবে নজির স্থাপন করেছিলেন। তিনি তার নিকটবর্তী রাজ্যগুলিতে ভ্রমণ ক’রে নিজের জ্ঞান গ্রহণক্ষম এবং আগ্রহী অনুগামীদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর শিষ্যদের নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, তারা যেন সারা বিশ্বে ঘুরে-ঘুরে তাঁর শিক্ষাগুলি সম্বন্ধে মানুষদের উদ্ভাসিত করেন। তিনি কখনও অন্য ধর্মের নিন্দা করতে এবং তাদের নিজস্ব ধর্ম ত্যাগ করে একটি নতুন ধর্ম গ্রহণ করতে বলেননি, কারণ তিনি কখনও নিজের ধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে চান নি। বুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিল যে, অন্যদের নিজস্ব অসুখীতা আর দুঃখের উপর বিজয় প্রাপ্ত করতে সহায়তা করা, যেটা তাদের মধ্যে বাস্তবতার সম্পর্কে বোধশক্তি না থাকার কারণে নিজেরাই নিজেদের জন্য জন্ম দেয়। পরবর্তী প্রজন্মের অনুগামীরা তাঁর উদাহরণে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন এবং তারা অন্যদের সাথে সেই উপায়গুলি শেয়ার করেছিলেন যেগুলি তাদের নিজের জীবনে উপযোগী মনে হয়েছিল। অতএব আজ আমরা যাকে “বৌদ্ধধর্ম” বলি, সেটা এরকমভাবেই দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল।

কখন-কখন, প্রক্রিয়াটি সংগঠিতভাবে বিকশিত হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, বৌদ্ধ বণিকেরা যখন বিভিন্ন দেশে গিয়েছিলেন এবং বসতি স্থাপন করেছিলেন, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কিছু সদস্যের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই এই বিদেশীদের আস্থার প্রতি আগ্রহ তৈরী হয়েছিল। যেমনটি পরে ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়ায় ইসলামের প্রবর্তনের সাথে ঘটেছিল। এই প্রক্রিয়াটি সাধারণ যুগের পূর্বে এবং পরের দুই শতাব্দীর মধ্যে মধ্য-এশিয়ার রেশম পথ (সিল্ক রুট) বরাবর মরূদ্যান রাজ্যগুলিতে বৌদ্ধধর্মের সাথেও ঘটেছিল। স্থানীয় শাসক এবং তাদের প্রজাগণ এই ভারতীয় ধর্ম সম্পর্কে আরও বেশী জানতে পেরে, তারা ঐ বণিকদের মাতৃভূমি থেকে ভিক্ষুদের পরামর্শদাতা অথবা শিক্ষক হিসাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত তারা অনেকে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। আরও একটি সংগঠিত পদ্ধতি হল খ্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর পরবর্তী শতাব্দীগুলিতে, বর্তমান মধ্য-পাকিস্তানের গান্ধারে বিদ্যমান বৌদ্ধ সমাজে গ্রীকদের মতো বিজয়ী মানুষদের ধীর সাংস্কৃতিক ঐকীকরণের মধ্য দিয়ে বৌদ্ধধর্ম গ্রহীত হয়েছিল।

মুখ্যতঃ, এই প্রচারটি এমন একজন শক্তিশালী সম্রাটের প্রভাবের কারণে ঘটেছিল, যিনি নিজে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং সমর্থনও করেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর মধ্যভাগে, সম্রাট অশোকের ব্যক্তিগত সমর্থনের পরিণামস্বরূপ বৌদ্ধধর্ম সমগ্র উত্তর ভারত জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই মহান সাম্রাজ্য নির্মাতা কখনও তাঁর প্রজাদের বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করার জন্য জোর করেননি, তবে তিনি তাঁর রাজ্য জুড়ে লৌহ স্তম্ভগুলিতে খোদাই করা নির্দেশগুলি স্থাপিত করে তাঁর প্রজাদেরকে নৈতিকভাবে জীবন-যাপনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। পাশাপাশি তিনি স্বয়ং নীতিগুলি অনুসরণ করে অন্যদের বুদ্ধের শিক্ষাগুলি গ্রহণ করার জন্য অনুপ্রাণিত করেছিলেন।

দূরবর্তী দেশগুলিতে ধর্ম-প্রচারক পাঠিয়ে সম্রাট অশোক তার সাম্রাজ্যের বাইরে সক্রিয়ভাবে ধর্ম প্রচার করেছিলেন। তিনি কখনও শ্রীলঙ্কার সম্রাট দেবনামপিয় তিসা-এর মতো বিদেশী শাসকদের আমন্ত্রণের ভিত্তিতে কাজ করেছিলেন। অন্য সময় তিনি নিজের উদ্যোগে ভিক্ষুদের ধর্মদূত হিসাবে প্রেরণ করেছিলেন। এই আগন্তুক ভিক্ষুগণ অন্যদেরকে ধর্ম পরিবর্তনের জন্য চাপ দিতেন না, বরং তারা কেবল বুদ্ধের শিক্ষাগুলির জ্ঞান মানুষদের কাছে উপলব্ধ করাতেন যাতে মানুষেরা নিজের নির্ণয় নিজেরাই করতে পারেন। এটাই হল তার প্রমাণ যে, দক্ষিণ ভারত এবং দক্ষিণ বার্মার মতো জায়গাগুলিতে, বৌদ্ধধর্ম খুব শীঘ্রই গৃহীত হয়েছিল। অন্যদিকে মধ্য-এশিয়ার গ্রীক উপনিবেশগুলির মতো জায়গাগুলিতে তাৎক্ষণিক প্রভাবের কোনও রেকর্ড নেই।

অন্যান্য ধর্মীয় রাজা, যেমন- ষোড়শ শতাব্দীর শক্তিশালী মঙ্গোল শাসক আলতান খান বৌদ্ধ শিক্ষকদের তাদের রাজ্যে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তিনি তার জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য এবং শাসনকে সু-সংহত করতে সাহায্য করার জন্য বৌদ্ধধর্মকে সেই দেশের সরকারী ধর্ম বলে ঘোষণা করেছিলেন। এই প্রক্রিয়ার জন্য তিনি হয়তো স্থানীয় অ-বৌদ্ধ ধর্মের কিছু পরম্পরাকে নিষিদ্ধ করেছিলেন এবং এমনকি হয়তো যারা সেটা অনুসরণ করত তাদের উপর অত্যাচার করেছিলেন, কিন্তু এই কঠোর পদক্ষেপগুলি মুখ্যতঃ রাজনৈতিকভাবে অনুপ্রাণিত হয়েই করা হয়েছিল। এই ধরণের উচ্চাকাঙ্খী শাসকেরা কখনও নিজের প্রজাদের বৌদ্ধ ধর্মের আস্থা বা উপাসনা পদ্ধতিগুলি অবলম্বন করতে বাধ্য করতেন না। এরকম করা কখনও ধর্মীয় বিশ্বাস হতে পারে না।

সারাংশ

শাক্যমুনি বুদ্ধ তাঁর শিক্ষাগুলিকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করতে নিষেধ করেছিলেন এবং শিক্ষাগুলি অনুসরণ করার পুর্বে ভালো করে পরীক্ষা করতে বলেছিলেন। এরপর আর কিছু বলার অপেক্ষা রাখে না যে, মানুষদের বুদ্ধের শিক্ষাগুলিকে কোনও অত্যুৎসাহী ধর্ম প্রচারক অথবা কোনও রাজকীয় ফরমান দ্বারা জোর করে গ্রহণ করা আবশ্যক নয়। সপ্তদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে, নেইজি টোয়িন পূর্ব মঙ্গোল যাযাবরদের বৌদ্ধধর্মের অনুগামী বানানোর জন্য প্রলোভন দিয়েছিলেন যে, একটা পদ কন্ঠস্থ করলে তাকে একটি গৃহপালিত পশু দেওয়া হবে। যাযাবর জাতিরা আধিকারিকদের এই ব্যাপারে অভিযোগ করেছিল। এরফলে, পরে সেই উদ্ধত শিক্ষককে দন্ডিত করা হয়েছিল এবং নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল।

বৌদ্ধধর্ম বিভিন্ন মানুষের চাহিদা এবং স্বভাবের সাথে মিল রেখে, বিভিন্ন ভাবে এশিয়ার বহু প্রান্তে শান্তিপুর্ণভাবে তার মৈত্রী, করুণা এবং প্রজ্ঞার বার্তা বহন করেছে।

Facebook Comments

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2018 tathagataonline.net
Theme Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!